যদিও পবিত্র কুরআনে আধুনিক বিজ্ঞানের সংজ্ঞানুযায়ী 'ভিনগ্রহী' শব্দটি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবুও মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্বের জোরালো ইঙ্গিত রয়েছে । ইসলামী চিন্তাবিদ ও ভাষ্যকারগণ কুরআনের কিছু আয়াতের উপর ভিত্তি করে এই বিষয়ে তাঁদের মতামত দিয়েছেন।
কুরআনের প্রধান ইঙ্গিতসমূহ:
রব্বুল আলামিন (বিশ্বজগতের প্রভু): সূরা ফাতিহার শুরুতে আল্লাহ নিজেকে "রব্বুল আলামিন" বা "বিশ্বজগতের প্রভু" হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন । এখানে 'আলামিন' শব্দটি বহুবচন, যা থেকে অনেক পণ্ডিত বিশ্বাস করেন যে পৃথিবী ছাড়াও আরও অনেক জগৎ রয়েছে এবং সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব ।আসমানের 'দাব্বাহ' (প্রাণী): সূরা আশ-শুরার ২৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে: "আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং এ দুয়ের মাঝে তিনি যা ছড়িয়ে রেখেছেন (প্রাণীজগৎ)" । আরবি শব্দ 'দাব্বাহ' সাধারণত পৃথিবীতে বিচরণকারী প্রাণীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই দাব্বাহ যে আকাশে বা মহাকাশে বিস্তৃত, তা ভিনগ্রহের প্রাণের অস্তিত্বের একটি প্রধান প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয় ।মহাজাগতিক প্রাণ বা সৃষ্টির অস্তিত্ব: সূরা আশ-শূরা (৪২:২৯) আয়াতে "দাব্বাহ" (دَابَّةٍ) বা জীব/প্রাণী শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা শুধুমাত্র মানুষ বা ফেরেশতাদের নির্দেশ করে না, বরং আকাশ ও পৃথিবীর বিশালতায় অন্য কোনো প্রাণ বা জীবের অস্তিত্ব থাকার দিকে ইঙ্গিত করে।
সাত আসমান ও সাত যমীন: পবিত্র কুরআনে সাত আসমান ও সাত যমীনের কথা বলা হয়েছে (সূরা তালাক: ১২), যা ইঙ্গিত দেয় যে, আমাদের এই পৃথিবীর মতো অন্যান্য জগত বা গ্রহেও প্রাণ থাকা সম্ভব
অদৃশ্য সৃষ্টির ধারণা: পবিত্র কুরআনে জ্বীন ও ফেরেশতাদের কথা বলা হয়েছে, যারা আমাদের মানুষের মতো দৈহিক কাঠামোর অধিকারী নয়, ফলে অনেক আলেম জ্বীনদের "এলিয়েন-সদৃশ" বা অপার্থিব সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করেন কারণ তারা আমাদের জগত থেকে ভিন্ন এক অদৃশ্য রাজ্যে বাস করে।
আল্লাহর অসীম সৃষ্টি: সূরা আল-নাহল (১৬:৮) আয়াতে বলা হয়েছে, "তিনি এমন অনেক কিছুই সৃষ্টি করবেন যা তোমরা জানো না" ।
অজানা সৃষ্টি: সূরা আন-নাহলের ৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে, "আর তিনি (আল্লাহ) এমন কিছু সৃষ্টি করেন যা তোমরা জানো না" এটি ইঙ্গিত করে যে আল্লাহর এমন অনেক সৃষ্টি রয়েছে যা মানুষের জ্ঞানের বাইরে।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতামত:
বিশিষ্ট ইসলামী পণ্ডিত ও ভাষ্যকারগণ এই বিষয়ে নিম্নলিখিত মতামত দিয়েছেন:
ফখরুদ্দিন আল-রাযী: এই ধ্রুপদী পণ্ডিত তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর কোটি কোটি জগৎ সৃষ্টি করার ক্ষমতা রয়েছে এবং সেগুলিতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব নয় ।
ডঃ ইয়াসির কাদী: এই আধুনিক ইসলামী চিন্তাবিদ বিশ্বাস করেন যে, কুরআন বা সুন্নাহ কোনোটিই ভিনগ্রহী বা মহাজাগতিক প্রাণের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না। বরং, সূরা বনী ইসরাঈলের ৭০ নং আয়াতের (যেখানে মানুষকে অনেক, কিন্তু সকল নয়, সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে) ব্যাখ্যায় তিনি মহাজাগতিক বস্তুতে বুদ্ধিমান প্রাণের সম্ভাবনাকে সমর্থন করেন।
আবদুল্লাহ ইউসুফ আলী এবং মুহাম্মদ আসাদ: এই বিখ্যাত কুরআনিক অনুবাদকগণ সূরা শুরার আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, মহাবিশ্বের লক্ষ লক্ষ গ্রহ ও নক্ষত্রে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ।
সতর্কতামূলক মন্তব্য: অনেক আলেম এও মনে করেন যে, যেহেতু ভিনগ্রহের প্রাণী সম্পর্কে কোনো সরাসরি তথ্য নেই, তাই এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা ঠিক নয়। তাদের মতে, ভিনগ্রহের প্রাণীর অস্তিত্ব আছে কি নেই, তা একজন মুমিনের ঈমানের উপর কোনো প্রভাব ফেলে না।
সংক্ষেপে, কুরআন অনুসারে, মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব অথবা মানুষের অজানা জগতের অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে সম্ভব এবং এটি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার একটি নিদর্শন তবে, অধিকাংশ আলেম এ বিষয়ে অকাট্য তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর পরামর্শ দেন।


0 মন্তব্যসমূহ
dnabdlive@gmail.com