সময় লোড হচ্ছে... তারিখ লোড হচ্ছে...
ব্রেকিং নিউজ
সর্বশেষ সংবাদ আপডেট হচ্ছে...
নোটিশ বোর্ড
লোডিং নিউজ...

সিএমপির ওসি আরিফুর রহমানের অপরাধ দমনে আপসহীনতা বনাম পেশাদারত্বের সংকট


মাহমুদ মিঠু

বিশেষ প্রতিবেদন

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন যেমন তাদের সাহসী ও সফল অভিযান দিয়ে করা হয়, ঠিক তেমনই মাঠপর্যায়ের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ নাগরিকদের প্রতি তাদের আচরণও সমান গুরুত্ব বহন করে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) আওতাধীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব পালন করা পুলিশ পরিদর্শক মো. আরিফুর রহমান এমনই একজন কর্মকর্তা, যার ক্যারিয়ারে একদিকে রয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের দমনে অনন্য সাফল্য, আর অন্যদিকে রয়েছে প্রশাসনিক তদারকি ও অধীনস্থদের অপেশাদার আচরণের কারণে সৃষ্ট বড় ধরণের বিতর্ক।সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানায় কর্মরত থাকাবস্থায় জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে পুলিশের হেনস্তা ও মারধরের ঘটনায় সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর এক আদেশে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। এই ঘটনার পর তার দীর্ঘ চাকুরিজীবনের সাফল্য, বায়েজিদ বোস্তামী ও খুলশী থানার কর্মকাল এবং নানা চড়াই-উতরাই নিয়ে সাধারণ মানুষ ও পুলিশ মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
খুলশী থানায় আড়াই মাসের কর্মকাল ও উল্লেখযোগ্য সাফল্য
২০২৬ সালের ২৫ মার্চ সিএমপির এক অফিস আদেশের মাধ্যমে পুলিশ পরিদর্শক মো. আরিফুর রহমানকে লাইনওয়ার থেকে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে পদায়ন করা হয়। খুলশী থানা এলাকা চট্টগ্রামের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ জোন, যেখানে কূটনৈতিক পাড়া, অভিজাত আবাসিক এলাকা এবং একই সাথে অপরাধপ্রবণ কিছু বস্তি অঞ্চলও রয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তিনি বেশ কিছু দৃশ্যমান ও সফল অভিযান পরিচালনা করেন।
  • অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার: ২০blank সালের ফেব্রুয়ারিতে খুলশী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে দেশীয় তৈরি একনলা বন্দুক ও কার্তুজসহ এক বিপজ্জনক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন তার টিম। এই অভিযানের ফলে ওই এলাকায় বড় ধরণের গ্যাং ওয়ার বা ছিনতাইয়ের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছিল।
  • আলোড়ন সৃষ্টিকারী ডাবল মার্ডার মামলার আসামি গ্রেপ্তার: ওসির ক্যারিয়ারে খুলশী থানার সবচেয়ে বড় সাফল্যটি আসে ২০২৬ সালের জুনের শুরুতে। চট্টগ্রাম নগরীতে সংঘটিত একটি চাঞ্চল্যকর ডাবল মার্ডার মামলার প্রধান আসামি এবং স্থানীয় যুবলীগ ক্যাডার মিজানসহ দুজনকে তার সরাসরি নির্দেশনায় পরিচালিত অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়। এই গ্রেপ্তারটি চট্টগ্রামের স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে বড় ধরণের ভূমিকা রেখেছিল এবং সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছিল।
  • মাদকবিরোধী ও কঠোর সুরক্ষামূলক অবস্থান: খুলশী এলাকার রেললাইন ও বস্তি কেন্দ্রিক মাদক সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে মো. আরিফুর রহমান শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করেছিলেন। নিয়মিত টহল জোরদার এবং কিশোর গ্যাং দমনে তার গৃহিত পদক্ষেপগুলো প্রশংসিত হয়েছিল।
বায়েজিদ বোস্তামী থানায় কর্মকাল: শীর্ষ সন্ত্রাসী দমন বনাম অস্থিরতা
খুলশী থানায় আসার আগে মো. আরিফুর রহমান সিএমপির অত্যন্ত অপরাধপ্রবণ ও শিল্পাঞ্চল সমৃদ্ধ বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে এই থানায় পদায়ন করা হয়েছিল। বায়েজিদ থানায় তার কর্মকাল ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও চ্যালেঞ্জিং।
  • শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ: বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের জন্য দীর্ঘদিনের আতঙ্ক ছিল ১০টিরও বেশি হত্যা ও চাঁদাবাজি মামলার আসামি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ। ওসি আরিফুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর সাজ্জাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে অলআউট ক্র্যাকডাউন শুরু করেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগীসহ ৬ জন সক্রিয় চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
  • লাইভে এসে ওসিকে পেটানোর হুমকি: পুলিশের এই কঠোর অ্যাকশনের কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে ওসি আরিফুর রহমানকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ এবং দেশে ফিরে পেটানোর হুমকি দেয়। এই ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সেই হুমকিতে পিছু না হটে ওসি আরিফুর রহমান সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত অবস্থান বজায় রাখেন এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে অভিযান আরও জোরদার করেন।
  • শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: বায়েজিদ ও নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার গার্মেন্টস ও ফ্যাক্টরিগুলোতে যেন কোনো ধরণের ঝুট ব্যবসা বা বহিরাগত চাঁদাবাজি না হতে পারে, সে ব্যাপারে তিনি মিল মালিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন।
 অতীত চাকুরিজীবনের সোনালী অধ্যায়: চট্টগ্রাম রেঞ্জের 'সেরা ওসি'
সিএমপিতে যোগদানের আগে মো. আরিফুর রহমান চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতাধীন জেলা পুলিশে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কর্মজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি আসে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ থানায় কর্মরত থাকাকালীন।
  • চট্টগ্রাম রেঞ্জের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট: কোম্পানীগঞ্জ থানায় দায়িত্ব পালনকালে মাদক উদ্ধার, সাজাপ্রাপ্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার, এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতির কারণে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১টি জেলার মধ্যে সামগ্রিক মূল্যায়নে 'সেরা ওসি' নির্বাচিত হন। তৎকালীন ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে এই শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার ও সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দিয়েছিলেন।
  • লোহাগাড়া থানায় দায়িত্ব পালন: ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানার ওসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখানেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক সহিংসতা দমনে সফল ভূমিকা রাখেন।
 ক্রিকেটার নাঈম হাসান হেনস্তা ও প্রত্যাহার
পরিদর্শক মো. আরিফুর রহমানের খুলশী থানার অধ্যায়ের আকস্মিক সমাপ্তি ঘটে ২০২৬ সালের ১২ জুন (শুক্রবার) রাতের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ঢাকা থেকে বিমানযোগে চট্টগ্রামে নেমে ক্রিকেটার নাঈম হাসান যখন সিএনজি অটোরিকশাযোগে বাসায় ফিরছিলেন, তখন লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে খুলশী থানার একটি টহল দল ডিবি পরিচয়ে তার গাড়ি থামায়।
নিজের পরিচয় দেওয়ার পরেও খুলশী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং পুলিশের সোর্স সোহেল ওই ক্রিকেটারের সাথে অত্যন্ত অপেশাদার আচরণ করেন এবং লাঠি ও পাইপ দিয়ে আঘাত করে তাকে জোরপূর্বক থানায় নিয়ে যান। থানায় নেওয়ার পরও ওসির তদারকির অভাব এবং পুলিশের অপেশাদার মনোভাব বজায় ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিলে সিএমপি প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তদারকি ও কমান্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ওসি আরিফুর রহমানকে ক্লোজড করে সিএমপি লাইনে সংযুক্ত করা হয়।
মো. আরিফুর রহমানের সামগ্রিক চাকুরিজীবনের খতিয়ান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি মাঠপর্যায়ের একজন অত্যন্ত সাহসী এবং অ্যাকশন-ওরিয়েন্টেড কর্মকর্তা, যিনি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বা খুলশীতে অপরাধ দমনে পিছপা হননি। তবে, একজন থানার প্রধান বা 'কমান্ডিং অফিসার' হিসেবে অধীনস্থ ফোর্স বা সাব-ইন্সপেক্টরদের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারাটাই তার জন্য বড় ব্যর্থতা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ক্রিকেটার নাঈম হাসানের মতো একজন জাতীয় বীরকে হেনস্তার ঘটনায় তার এই প্রত্যাহার কেবল তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারেরই ক্ষতি করেনি, বরং এটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে—অপরাধ দমনে সাফল্য যতই থাকুক না কেন, সাধারণ জনগণের সাথে অপেশাদার আচরণ কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করলে আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থায় পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ