চট্টগ্রামকে পর্যটন শহর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বন্দর নগরীর বাকলিয়া এলাকায় কর্ণফুলী নদীর ৩ কিলোমিটার তীরজুড়ে এই পর্যটন জোন স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। 'কালুরঘাট সেতু থেকে চাকতাই খাল পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীরে সড়ক নির্মাণ' প্রকল্পের আওতায় এই পর্যটন জোনের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। সিডিএ'র উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী বাসসকে জানান, এই প্রকল্পের আওতায় শাহ আমানত সেতু থেকে বলিরহাট পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় রেস্তোরাঁ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পের তহবিল থেকে এই পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় করা হবে। তিনি আরও জানান, পর্যটন কেন্দ্রটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। স্থানীয় বাসিন্দা জাবেদ আহমেদ বলেন, পর্যটন অঞ্চল নির্মিত হলে এই এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম এবং এর আশপাশের উপজেলাগুলোতে পর্যটকদের আকর্ষণের মতো নানা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান—যার মধ্যে রয়েছে মনোরম সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, ম্যানগ্রোভ বন, জলপ্রপাত এবং হ্রদ। সিডিএ'র সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, এখানে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে বন্দর নগরীটি প্রকৃত অর্থেই একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। তবে কর্তৃপক্ষকে নদী পরিষ্কার রাখার বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। পর্যটন উদ্যোক্তা এবং চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) পরিচালক এ এস এম ইসমাইল খান বলেন, সরকার যদি পর্যটন কেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে সক্ষম না হয়, তাহলে বেসরকারি বা যৌথ উদ্যোগে এইসব কেন্দ্রের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। সিডিএ'র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় 'কালুরঘাট-চাক্তাই চার লেনের মেরিন ড্রাইভ সড়ক' প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালের জুন মাসে চাকতাই খালের মোহনায় একটি স্লুইস গেট নির্মাণের মাধ্যমে প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্প পরিচালক রাজীব দাস বলেন, নির্মাণ কাজ শেষ হলে এই সড়কটি সিটি বাইপাস লুপ রোড ও অক্সিজেন-কুয়াইশ সংযোগ সড়কের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং শহরের যানজট কমাতে সাহায্য করবে। তিনি আরও বলেন, কাপ্তাই, রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলা থেকে শহরে আসা যানবাহনগুলো এই সড়কপথ ব্যবহার করে শহরের কেন্দ্র এড়িয়ে বিমানবন্দর ও পতেঙ্গা এলাকা এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামে যেতে পারবে। অপরদিকে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলো থেকে আসা যানবাহনগুলোও এই পথে শহরের উত্তর দিকে যেতে সক্ষম হবে। তিনি জানান, ৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের ৯২ শতাংশ নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সড়কটি সম্পূর্ণ চালু হলে এর বহুমুখী সুফল পাওয়া যাবে। এর ফলে নগরের জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, নদীতীর সংরক্ষণ, নগর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং পর্যটন খাতের বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বাসসকে জানান, এই প্রকল্পে সিডিএ মাস্টার প্ল্যান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ তিন কিলোমিটার দীর্ঘ পর্যটন অঞ্চল গড়ে তুলবে। বাকলিয়া চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম অনুন্নত এলাকা হিসেবে বিবেচিত। এই এলাকার উন্নয়নে বেসরকারি বা যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, নগরীর বাকলিয়া একটি জনবহুল এলাকা হলেও এখানে বিনোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা নেই। এই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এলাকাটির সামগ্রিক চিত্র বদলে যেতে পারে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে। তাদের মতে, এই নতুন পর্যটন কেন্দ্রটি শুধু বাকলিয়ার মানুষকেই নয়, বরং পুরো চট্টগ্রাম নগরীর মানুষকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেবে।