দ্রুত নগরায়ণের ফলে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গত দুই দশকে অসংখ্য পুকুর ও জলাশয় হারিয়ে গেছে। সেসব স্থানে এখন দাঁড়িয়ে আছে বহুতল ভবন। অনেক এলাকার নামে ঐতিহাসিক পুকুর বা দিঘির পরিচিতি টিকে থাকলেও, জলাশয়ের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে নগরীর একদম প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত লালদিঘি যেন সে ধারার ব্যতিক্রম। আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে এই জলাধার, যার পেছনে রয়েছে দিঘিটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ক। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের দেওয়ানি বা শাসনভার গ্রহণের পর একটি ছোট পুকুর থেকে বড় দিঘিতে রূপ নেওয়া এই জলাধারকে ঘিরে এ অঞ্চলে নানা কিংবদন্তিও প্রচলিত আছে। চারপাশে প্রাচীর এবং হাঁটার পথ নির্মাণের মাধ্যমে নতুন করে সাজানো হয়েছে ‘লালদিঘি পার্ক’। এটি এখনো নগরবাসীর অবসর কাটানো এবং খোলা আকাশের নিচে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার নিবিড় আশ্রয়স্থল। লালদিঘি এলাকা চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ের গণসমাবেশের স্মৃতি বহন করছে এই দিঘি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গল্পও। সব মিলিয়ে লালদিঘি শুধু একটি জলাধার নয়, এটি বন্দরনগরীর ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক প্রতীকী স্থান। চট্টগ্রামের প্রাচীন নগরকেন্দ্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে লালদিঘির নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে যায় বন্দরনগরীর রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং নাগরিক জীবনের অবসর যাপনের এক পরিচিত ছবি। লালকুঠির ছায়ায় রক্তবর্ণ হয়ে উঠত দিঘির পানি- চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্র আন্দরকিল্লার কাছেই ২ দশমিক ৭০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত লালদিঘি। এর উত্তর-পশ্চিম পাশে বাণিজ্যিক কেন্দ্র আন্দরকিল্লা, পূর্ব পাশে চট্টগ্রাম কারাগার এবং দক্ষিণ পাশে জেলা পরিষদ ভবন ও ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দান অবস্থিত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ১৭৬১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসনভার গ্রহণ করে। তখন ‘এন্তেকালী কাছারি’, অর্থাৎ জমিসংক্রান্ত তহসিল অফিসে—বর্তমানে যেখানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সদর দপ্তর—লাল রং করা হয়েছিল। এ কারণে ভবনটি স্থানীয়দের কাছে ‘লালকুঠি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। লালকুঠির পূর্ব দিকে ছিল জেলখানা। সেটিও লাল রঙে রাঙানো হয়েছিল বলে একসময় ‘লালঘর’ নামে ডাকা হতো। বলা হয়ে থাকে, ভবন দুটি লাল পাগড়ি পরা ব্রিটিশ পাহারাদারদের দ্বারা নজরদারিতে থাকত। অনেকের মতে, এ কারণেই ভবনগুলোর নাম লালঘর ও লালকুঠি হয়েছে। এই ভবনগুলোর পাশেই ছিল একটি ছোট পুকুর। প্রচলিত আছে, বিকেলের সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ত, তখন লালকুঠির ছায়া পড়ে পুকুরের পানি রক্তবর্ণ দেখাত। সেই দৃশ্য দেখেই স্থানীয়রা জলাশয়টির নাম রাখে ‘লাল পুকুর’ বা ‘লালদিঘি’। পরবর্তী সময়ে ইংরেজ শাসকরা পুকুরটি আরও বড় করে দিঘিতে রূপান্তরিত করে। লালদিঘির উত্তর পাশে অবস্থিত একটি মসজিদ, যার বর্তমান নাম লালদিঘি শাহী জামে মসজিদ। মসজিদটির গম্বুজে ১৯৩৯ সাল এবং তকী ইসমাইল মুহাম্মদের নাম লেখা আছে। তিনি ছিলেন রাউজান উপজেলার চিকদাইর গ্রামের একজন জমিদার। অবসর সময়ে তিনি তখনকার খোলামেলা লালদিঘির পাড়ে সময় কাটাতেন এবং দিঘিটির অভিভাবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি দিঘিটির মালিকানা মুসলিম হাই স্কুলের হাতে তুলে দেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে উত্তর-দক্ষিণ সড়ক নির্মিত হওয়ার পর মিউনিসিপ্যাল ময়দান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এর পূর্ব অংশ সাধারণ মানুষের খেলার মাঠে পরিণত হয়। পরে মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে মাঠটি বিদ্যালয়টির খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে এই মাঠ লালদিঘির মাঠ নামে পরিচিত। কিংবদন্তি আছে- ‘অনেক খুনে লাল লালদিঘির পানি’ : লালদিঘিকে ঘিরে এ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে একটি চমৎকার কিংবদন্তিও প্রচলিত। রূপকথার মতো সেই গল্পটি অনেকটা এমন— একবার এক দিনমজুরের মেয়ে লালদিঘিতে গোসল করতে নামলে হঠাৎ তার পায়ে শিকল বেঁধে তাকে পানির নিচে রূপকথার দেশের এক বাদশার দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই বাদশার বিয়ে ঠিক হয়েছিল কোনও এক ‘লাল বেগম’-এর সঙ্গে। কিন্তু তিনি এক ক্রীতদাসের সঙ্গে পালিয়ে গেলে, বিষয়টি না জেনেই বাদশার কাছে লাল বেগমের ভূমিকায় অভিনয় করতে দিনমজুরের মেয়েটিকে ধরে আনা হয়। পরবর্তীকালে এক কথোপকথনে তার প্রকৃত পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে ক্রুদ্ধ হয়ে বাদশা আসল লাল বেগমকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। পরে জানা যায়, লাল বেগম আন্দরকিল্লার দিঘি থেকে দুইশো হাত দূরে পর্তুগিজদের কিল্লায় অবস্থান করছেন। এরপর বাদশা সেই কিল্লা আক্রমণ করেন। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, যুদ্ধে এত রক্তপাত হয়েছিল যে দিঘির পানি রক্তে লাল হয়ে যায়। তবে সেই যুদ্ধে বাদশা পরাজিত হন এবং সবাই পালিয়ে যায়। তবুও লাল বেগমকে উদ্ধারের আশায় বাদশা নাকি দিঘির পাড়েই থেকে যান। আরেকটি ধারণাও লোকমুখে প্রচলিত। ইংরেজ শাসনামলে এক লাল মেমসাহেবের নির্দেশে অথবা তার স্মরণে এই দিঘিটি খনন করা হয়েছিল। সেই থেকেই নামকরণ হয় ‘লালদিঘি’। ইতিহাস যাই বলুক, আড়াই

.jpg)
0 মন্তব্যসমূহ
dnabdlive@gmail.com