পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, মানবাধিকার রক্ষা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের কারণে অন্যায়ভাবে আটক বা কারাগারে না রাখার ব্যাপারে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আজ বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কাউকে অন্যায়ভাবে আটক বা কারাগারে রাখা হবে না—সরকার তা নিশ্চিত করবে।’ শামা আরও বলেন, সঠিক আইনি প্রক্রিয়া ও মৌলিক অধিকারের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার সব রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের জন্যই প্রযোজ্য, যার মধ্যে বিরোধী দল এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য যেকোনো দল—রাজনৈতিক পরিচয় এখানে প্রাসঙ্গিক নয়; বর্তমান সরকার নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিশোধের কারণে কাউকে অন্যায়ভাবে কারাগারে রাখা হবে না।’ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নজিরবিহীনভাবে ঘটেছে এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা এর সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছরে বাংলাদেশে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে, ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে ঘটেনি। সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তরা হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও এর নেতাকর্মীরা।’ শামা বলেন, সরকার অতীতের তথাকথিত ‘ফ্যাসিবাদী যুগের’ পুনরাবৃত্তি চায় না এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তিনি বলেন, ‘আমরা অতীতের ফ্যাসিবাদী যুগের পুনরাবৃত্তি এখন বা ভবিষ্যতে কখনোই চাই না। আমরা প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, নাগরিকদের অধিকার রক্ষা এবং বিচারব্যবস্থা যেন রাজনৈতিক প্রতিশোধের দ্বারা পরিচালিত না হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকারের অবস্থান হলো, আমরা মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করছি। আমরা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।’ পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সব দেশের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ রক্ষাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রথমত এবং প্রধানত “বাংলাদেশ নীতি”। আমরা সবার সঙ্গে সমান অধিকার নিয়ে এবং নিজেদের স্বার্থ মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই।’ শামা বলেন, নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন কথা বলে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন কথা বলেন, তখন চীনসহ অন্যান্য অংশীজন আমাদের কথা আরও গুরুত্বের সঙ্গে, আরও গভীরভাবে শোনে।’ তিনি যোগ করেন, ‘এখন যেহেতু বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে, তাই আলোচনায় আমাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী।’ রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে শামা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকটের টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক শক্তি কাজে লাগাতে চায়। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সমস্যা। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আমাদের রাজনৈতিক উপায়েই সমাধান করতে হবে।’ তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছি।’ আগামী সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের একটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে 




তিনি বলেন, এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। শামা বলেন, সমাধানের পথে গতি আনতে মুসলিম বিশ্ব মিয়ানমারের ওপর আরও বেশি চাপ প্রয়োগ করতে পারে কি না, বাংলাদেশ তা খতিয়ে দেখবে। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেকে সংকট আরও জটিল হয়েছে। বিশেষত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে এই জটিলতা বেড়েছে। রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও অন্যান্য পক্ষের উত্থান এবং মানবপাচার ও মাদক চোরাচালানসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। শামা বলেন, ক্যাম্পে নিয়মিত নতুন রোহিঙ্গা আসা এবং শিশুর জন্ম অব্যাহত থাকায় বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। তিনি বলেন, ‘এ কারণে এই মুহূর্তে সঠিক সংখ্যা আমরা জানি না। তবে এটি অবশ্যই ১৩ লাখের বেশি হবে।’ তিনি জানান, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার শিশু রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জন্ম নিচ্ছে। শামা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সংকট সমাধানে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে বেইজিংয়ের দৃঢ় আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। জাতিসংঘ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত না হলে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তা বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত কূটনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। তিনি বলেন, ‘সেখান থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলার একটি শক্তিশালী সুযোগ তৈরি হবে। আমরা মনে করি, অন্তত আগামী এক বছরে আমরা এই সক্ষমতাকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারব।’ শামা বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ তার ‘বাংলাদেশ নীতি’ অব্যাহত রাখবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।